বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট: নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের অভাবই দায়ী

২০০৯ সাল থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪৯২৪ থেকে সাড়ে চার গুণ বেড়ে ২২৩৪৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে (বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী)। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির ১০% লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কমপক্ষে $২.৫ বিলিয়ন বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিলো।

বাংলাদেশের মানুষ গত সপ্তাহ থেকেই প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা বা এমনকি গ্রামীণ এলাকায় এর চেয়েও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ছাড়া দিন কাটাচ্ছে। আর এর জন্য সরকার বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের অতিরিক্ত মূল্যকে দায়ী করছে।

মোহাম্মদ ইয়ামিন

বাংলাদেশের সরকার বলছে যে চলমান বিদুৎ সংকটকে ঠিক লোডশেডিং বলা যায় না যেটা কয়েক বছর আগেও দেশের বিদ্যুতের গ্রাহকদের কাছে নিয়মিত ঘটনা ছিলো। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও তেলের সরবরাহ কম হওয়ার কারণেই বর্তমানে এই পরিস্থিতির সৃষ্ঠি হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আরও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হলেই লোডশেডিং আর থাকবে না।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চলমান জ্বালানি সংকটের কারণ ও উপায় ব্যাখ্যা করার সময় টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য শক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন যে সরকার যদি ২০১০ এবং ২০১৬ সালের বিদ্যুতের মহাপরিল্পনা ও প্রতিশ্রুতিনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরি করতো তাহলে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট এড়ানো যেত।

তাদের মতে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট নবায়নযোগ্য শক্তিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং জীবাশ্ম জ্বালানীতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগের কারণেই সৃষ্ঠি হয়েছে।

বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটারনাল ডেবট এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট আগ্রহী নয়।

হাসান মেহেদী বলেন “বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হলে আমাদেরকে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে হতো না।”

তিনি আরও বলেন “আমরা যে এখন ১৫০০ থেকে ২০০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ে ভুগছি তা প্রাথমিক জ্বালানীর কোনো খরচ ছাড়াই নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করা যেত”।

 

ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা

ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল অনুসারে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্য ২০১০ সালে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu) $৭.৫ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে তা $৩৮.৯৯ প্রতি MMBtu হয়েছে, S&P Platts-এর তথ্যমতে।

এদিকে, কয়লার দাম ২০১০ সালে প্রতি টন ৯৪ ডলার থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৪০৯ ডলার হয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ প্রাথমিক জ্বালানির ওপর ভিত্তি করেই তার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করেছে যেখানে ৫১.৪৯% গ্যাস, ৩৩.১১% তেল এবং ৪% কয়লার ভাগ রয়েছে।

অন্যদিকে উৎপাদনের সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য শক্তির ভাগ মাত্র ০.৫৯% যা ২০১০ সালের বিদ্যুতের মহাপরিল্পনা ও প্রতিশ্রুতিনুযায়ী ১০% হওয়ার কথা ছিলো।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জাকির হোসেন খান বলেছেন যে সরকার ব্যয়বহুল প্রাথমিক জ্বালানি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে যার জন্য তারা প্রতি বছরই বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে যদিও গত ১২ বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১১৮%।

তিনি আরও বলেন যে আমরা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার উৎসগুলোকে সবসময়ই অবহেলা করেছি। নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষ করে সৌর এবং বায়ু শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গত ১০ থেকে ১২ বছরে অনেক কমেছে। কিন্তু আমরা ব্যয়বহুল উৎসগুলোতেই বিনিয়োগ করেছি।

ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সির রিনিউয়েবল পাওয়ার জেনারেশন কস্টস ইন ২০২১ এর রিপোর্ট অনুসারে, নতুন চালু হওয়া ইউটিলিটি স্কেলের সোলার পিভি প্রোজেক্টের শক্তির সমতলিত খরচের বৈশ্বিক ওজনের গড় ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৬৮% কমেছে।

এটি আরও তথ্য দেয় যে ২০১০ সালে প্রতি kWh জীবাশ্ম গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল $০.০৮১৬, যেখানে সৌর ফটোভোলটাইক বৈদ্যুতিক শক্তি ছিল $০.৪৩৭৯।

কিন্তু ২০২২ সালে, জীবাশ্ম গ্যাস-চালিত বিদ্যুতের দাম প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় $০.২৬৯১-এ বেড়েছে, আর সোলার PV-চালিত বিদ্যুতের দাম $০.০৬৩৬-এ নেমেছে।

নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষ করে সৌর এবং বায়ু শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গত ১০ থেকে ১২ বছরে অনেক কমেছে। কিন্তু আমরা ব্যয়বহুল উৎসগুলোতেই বিনিয়োগ করেছি।

 

নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ নেই

২০০৯ সাল থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪৯২৪ থেকে সাড়ে চার গুণ বেড়ে ২২৩৪৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে (বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী)।

কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির ১০% লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কমপক্ষে $২.৫ বিলিয়ন বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিলো।

সঠিক প্রণোদনার অভাব

জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বেসরকারি খাতকে জমি অধিগ্রহণ এবং উপকরণ আমদানির জন্য কর মওকুফসহ একাধিক প্রণোদনা দিয়েছে।

কিন্তু নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ধরনের প্রণোদনা অনুপস্থিত ছিলো। বরং সোলার পিভি এবং অন্যান্য আমদানিতে কর এবং শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।

অধিকন্তু, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য তাদের সহায়তা চাওয়ার সময় কর্তৃপক্ষকে অনিচ্ছুক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি তারা বেসরকারী খাতের দ্বারা নেওয়া নবায়নযোগ্য উদ্যোগগুলিকে নিরুৎসাহিত করছিল।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এই বিষয়ে বলেন, কাগজে-কলমে নীতিমালা থাকলেও ছিল বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত পর্যায়ে হয়নি।

Related Analysis