বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি হুমকির মুখে

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে ভুল জ্বালানি নীতি, সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান দুর্দশা সৃষ্ঠি হয়েছে।

এই মতামতটি ৩০ জুলাই, ২০২২ তারিখে নিউ এইজে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

এমরান হোসেন

ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছর পর ক্ষমতাসীন সরকার ২০১০ সালে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন পাস করে  প্রচুর দুর্নীতি এবং অবৈধ মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার এই আইনের মাধ্যমে অযাচিত দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারী বিনিয়োগকারীদেরকে এমন শর্তে ৯৪টির মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ দিয়েছে যা দেশের অর্থনীতিকে দিনশেষে বিপদেই ফেলেছে।

২০০৯ সাল থেকে সরকার নিজ উদ্যোগের পাশাপাশি পার্টনারশিপের মাধ্যমেও আরও ৩২ বিদ্যুৎ সক্ষমতা কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যার ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচগুণেরও বেশি বেড়ে ২৫,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ এবং ট্রান্সমিশন সিস্টেমে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অস্বাভাবিক দ্রুত বিকাশ সরকারকে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এমনকি জ্বালানীর ঘাটতি এবং অধিক দামের কারণে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন ২৬ জুলাই নিউ এইজকে বলেন, “জ্বালানীর সঙ্কট সব সময়ই ছিল। কিন্তু সরকার এখন আর বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে পারছে না ”। 

শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণার মাত্র চার মাস পরেই সরকার এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং চালু করে, যা দিনে ১৩ ঘন্টাও স্থায়ী হয়। এতে দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি ব্যাহত হচ্ছে।

সরকার বর্তমান সঙ্কটের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করতে চেয়েছিল। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন যে সরকার চাইলেই এই সংকট এড়াতে পারতো, কিন্তু আগেই তারা সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

ইজাজ হোসেন আরও বলেন যে কোনো বিচক্ষণ প্রশাসকই প্রাথমিক জ্বালানির টেকসই উৎসের ব্যবস্থা না করে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এরকম অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতো না।

তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন এবং নীতি নিরর্ধারকদের প্রায় সবাই এটা জানতো যে বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতি কখনই জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে সেই সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে পারবে না।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাওয়ার প্লান্ট অপারেটরদের কাছ থেকে উৎপাদনের আগেই প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তার গুরুত্বের বিষয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন।

 

বাংলাদেশে বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপারেটরদের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিল এবং জ্বালানীর ঘাটতির কারণে তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অপারেটরদের অস্বাভাবিক মুনাফার ব্যবস্থাও এই সরকারই করে দিয়েছে।

ইজাজ হোসেনের মতে বর্তমান সংকট শুধু একটি ভুলের ফল নয় বরং ধারাবাহিক অনেকগুলো ভুলের পরিণতি।

গত ২৬ জুলাই পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জ্বালানীর ঘাটতির কারণে ৪,১২৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৪২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা যায়নি।

প্রাথমিক জ্বালানীর ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ কখনই তার সম্পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেনি, বিশেষ করে গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যেখানে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

পিডিবি তথ্যমতে, কোভিড মহামারী এবং সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন বৈশ্বিক সঙ্কট শুরু হওয়ার আগে গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ অব্যবহৃতই ছিলো।

২০২০ সালে এলএনজির দাম ইতিহাসে সর্বনিম্ন থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের ঘাটতি জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সমস্যায় ফেলতে শুরু করে।

বাংলাদেশের কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতারও কয়লার ঘাটতির কারণে কম ব্যবহার করা হয়েছে যখন সরকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রাথমিক জ্বালানি ডিজেলের অত্যধিক মূল্যের কারণে ১২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থগিত করেছিলো।

ইজাজ হোসেন আরও মনে করেন প্রযুক্তি বিবেচনায় শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্তটিই ভুল ছিলো।

২৫,০০০ মেগাওয়াট ইনস্টল করা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪,৯৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পেরেছে। কারণ বিতরণ এবং সঞ্চালন অবকাঠামোগুলো দ্রুত বর্ধিত উৎপাদন ক্ষমতার সাথে কখনই সমন্বয় করা হয়নি।

বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডেবট (বিডব্লিউজিইডি) এর তথ্য অনুসারে, অব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষমতা মাঝে মাঝে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে এবং সরকার ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বেসরকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে মোট ৭১,৫৬৭ কোটি টাকা দিয়েছে।

২৬শে জুলাই বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডেবট (বিডব্লিউজিইডি) এর সদস্য-সচিব হাসান মেহেদী বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জকে অন্যভাবে জনগণের অর্থ ব্যক্তিগত পকেটে, আবার কখনো বিদেশী কোম্পানিতে স্থানান্তরের একটি মাধ্যম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।”

বেসলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের সময় তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার জন্য ২০১০ সালে সর্বাধিক পাঁচ বছরের সময়সীমার সাথে চালু হওয়া ব্যয়বহুল ভাড়াকৃত পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে প্রদত্ত ক্যাপাসিটি চার্জের একটি বড় অংশ চলে গিয়েছে।

যেমন ১,৩২০ মেগাওয়াট রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ নয় বছরেও শেষ করা যায়নি। প্ল্যান্টের জন্য ৪১ মাসের নির্মাণের সময়সূচী প্রায় ৫৫ মাস আগে শেষ হয়েছে।

এছাড়া রামপাল প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও প্রস্তুত হয়নি। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের অভাবে ১,৩২০ মেগাওয়াট পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

বিডব্লিউজিইডির মতে, ভাড়া পাওয়ার প্ল্যান্টে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বিদ্যুতের দাম ৬৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। অন্তত ১৪টি রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এখনও চালু আছে, যার মধ্যে কয়েকটি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু আছে!

একটি ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র আসলে ছোট পাওয়ার জেনারেটরের সংমিশ্রণ যা সাধারণত অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলোতে লোডশেডিং মোকাবেলার জন্য ব্যবহৃত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময়ে এই ধরনের ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র অর্থনীতিতে কোন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না।

গত ২৭ জুলাই তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সংগঠক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন , “বর্তমান সংকট সরকারের নিজের তৈরি। এটা দুর্নীতি, ভুল নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অদক্ষতার ফল” ।

বিশেষজ্ঞদের আশংকা শেষ পযন্ত সত্য হয়েছিল কারণ স্পট বাজারে এলএনজির মূল্য মে ২০২০ এবং জুলাই ২০২২ এর মধ্যে গড়ে প্রায় আটগুণ বেড়েছে৷ একইভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম একই সময়ের মধ্যে প্রায় চার গুণ বেড়েছে৷ কয়লার দামও বাড়ছে।

এসব সংকট সত্ত্বেও সরকার বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ অনুসন্ধান বা প্রাথমিক জ্বালানির উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বলতে গেলে বিনিয়োগই করেনি।

সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের ক্ষয়প্রাপ্ত গ্যাসের রিজার্ভ সম্পর্কে ভালভাবে অবগত ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আনেনি। যদিও ভূতাত্ত্বিকদের বিশ্বাস যে বাংলাদেশে যথেষ্ট গ্যাস মজুদ রয়েছে।

তবে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনানুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি বাস্তবায়িত হলে সরকার এখান থেকেই উৎপাদিত ২,৫০০ মেগাওয়াট দিয়ে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করতে পারতো।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকার ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় কয়লাতে এবং তারপর ২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনায় এলএনজিতে নির্ভরতা বাড়িয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেই জীবাশ্ম জ্বালানির টেকসই বিকল্প হিসেবে মনে করছেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ২ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

ইজাজ হোসেন এই প্রসঙ্গে বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি রাতে ১৬ টাকায় এক ইউনিট বিদ্যুৎ দিতে পারে। আর দিনের বেলা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখন আট টাকা। আর ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ১৫ টাকা থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।”

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম ২৭শে জুলাই বলেন, “দ্রুত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আইন বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে, যা শেষ পর্যন্ত একে পতনের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।”

শামসুল আলম আরও মনে করেন যে আইনের কারণে আমলারা কোনো দ্বিধা কিংবা ভয় ছাড়াই দুর্নীতি করছেন এবং এতে করে নিয়মকানুন মানার কোন তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। তিনি আরও যোগ করেন এর ফলে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় অত্যধিক হয়ে উঠেছে আর সাধারণ মানুষেরও জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান বিদ্যুৎ খাতের ব্যর্থতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন,‘বর্তমান সংকটের মূল কারণ হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট। এর সাথে অন্য কোনো কারণ যুক্ত করা বিভ্রান্তি সৃষ্ঠি করতে পারে।” সেপ্টেম্বরের পর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

Related Analysis