চলমান সংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে গুরুত্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও টেকসই উন্নয়নে বেশ কয়েক দশক ধরেই বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে করোনা পরিস্থিতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের উপযোগিতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। অনেক দেশ করোনার প্রভাবে থমকে যাওয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা বিশ্ব জ্বালানির বাজার এবং মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য, বিভিন্ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে যেমন হুমকির মুখে ফেলেছে, তেমনি আরো একবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

এই মতামতটি সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২২ তারিখে বণিক বার্তায়  প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

শফিকুল আলম

গত এক দশকের বেশি সময়, আমাদের দেশে বিবিধ উদ্যোগ নেয়া হলেও, অংশীজনদের মতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি। অনেকের মতে, ঋণের সুদের হার এখনো বেশি। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের বিনিয়োগ উঠে আসার সময়কাল অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে বেশি হলেও প্রায়ই আলাপ-আলোচনায় শোনা যায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি ঋণ দিতে উৎসাহী নয়। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাংলাদেশে খুব ধীরে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রকল্পে সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে সুবজ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করে। এর আওতায় প্রথম দিকে সুদের হার বেশি ছিল কিন্তু ধাপে ধাপে তা কমানো হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় সবুজ বিনিয়োগে প্রণোদনার অংশ হিসেবে, সুদের হার ৯ শতাংশের পরিবর্তে ৭-৮ শতাংশ এবং ঋণের মেয়াদ আট বছরের বেশি করার সুযোগ দেয়া হয়। এবার জুলাই ২০২২-এ সুদের হার আরো একবার কমিয়ে ৫-৬ শতাংশ করা হয়। কাজেই বহুদিন যে সমস্যগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বিনিয়োগে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা বহুলাংশে দূর হয়েছে বলা যায়। হয়তোবা সব অংশীজনের কাছে এ তথ্যগুলো এখনো পৌঁছেনি। এক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিতে পারে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ছাড়াও দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। উদ্যোক্তারা এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।

বড় প্রকল্প যেমন ৫০ মেগাওয়াট (পিক) বা তার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন হলে কয়েকটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে গোষ্ঠীবদ্ধ/সংঘবদ্ধ ঋণ দিতে পারে। বিভিন্ন খাতের বড় প্রকল্পে গোষ্ঠীবদ্ধ/সংঘবদ্ধ ঋণের অনেক সফল উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দেশে বাস্তবায়িত বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজের মানের ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা করতে পারে। সঙ্গে একটি রেটিংয়ের ব্যবস্থাও চালু করতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পর প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর রেটিং পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যেসব প্রকল্পে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা প্রস্তাবে উল্লেখ থাকবে, তাদের দ্রুততার সঙ্গে সবুজ পুনঃঅর্থায়নের আওতায় আনা যেতে পারে ।

আবার ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ হয়ে পড়ে। যে কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করার পরও অনেক প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বেশ কয়েকটি প্রকল্প ২০২২ সালে কিংবা ২০২৩-এর মাঝামাঝি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো এখনো পরিকল্পনাধীন। উপযুক্ত জমি না পাওয়া কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জমির যে মূল্য ধরা হয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে। অনেকেই মনে করেন বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও আন্তঃসংযোগের দায়িত্ব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানিকে দেয়া হয় বলে ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্প গতি হারিয়ে ফেলে।

এক্ষেত্রে সরকার যদি জমি সংকুলানের দায়িত্ব নেয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে গতি আসবে বলা যায়। তবে সমীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কোন জায়গাগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা যায়। সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও আন্তঃসংযোগের দায়িত্ব সরকারি সংস্থা নিলে অনেক প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে আমাদের যে নীতি উপকরণ রয়েছে তার মধ্যে নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০১৯ অন্যতম। কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে গতিশীল করতে এর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। সহজভাবে বললে এ ধরনের প্রকল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য আর্থিকভাবে বেশ লাভজনক। তথাপি সবাই এর আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে অবহিত নয় কিংবা তাদের ধারণা যে সবুজ প্রকল্পে ব্যাংকঋণের সুদের হার এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা বা যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

তবে ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্পগুলোর জন্য এখনো অনিষ্পন্ন প্রস্তাব গ্রহণ করা হচ্ছে, যা প্রকল্পের প্রবক্তাদের মাঝে প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে না। মনে রাখা জরুরি, অত্যন্ত ব্যয়বহুল সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করেই বিশ্বব্যাপী খরচ কমানো হয়েছে। বিভিন্ন দেশ প্রথমে ফিড-ইন-ট্যারিফের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মাঝে আর্থিক লাভের সুযোগ করে দেয়। অনেক কোম্পানি গবেষণায় বিনিয়োগ করে এবং মিতব্যয়ী উৎপাদন মাত্রা অর্জন করে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের খরচ কমাতে সক্ষম হয়। আর খরচ কমার সঙ্গে ফিড-ইন-ট্যারিফও কমাতে থাকে। পরবর্তী সময়ে নিলামের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা আরো বাড়িয়ে, কম দরদাতাকে ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্পের কাজ দেয়া বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমাদের ক্রমান্বয়ে অকশনের দিকে যেতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা নিতে হলে এর বিকল্প খুব একটা নেই।

এদিকে আমদানীকৃত ইনভার্টারের ওপর কর ও মূল্যসংযোজন কর বাবদ প্রায় ৩৭ শতাংশ খরচ করতে হয়। সরকার এ খরচ কমিয়ে দিলে প্রকল্প ব্যয় কমবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি আরো সাশ্রয়ী হবে।

পরিশেষে কারখানা বা বাণিজ্যিক ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ালে, মাসিক বিদ্যুতের খরচ কমার সঙ্গে আমাদের জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। ইউটিলিটি স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য বিবেচনায় নিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাতে সহায়ক হবে। শুধু বর্তমান নয়, ভাবতে হবে ভবিষ্যতের পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়েও। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ বা অপ্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে এখন থেকেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানি আমদানি হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না কিন্তু হ্রাস করা যাবে নিশ্চিতভাবেই যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেয়া হয়। আর ২০৪১ সাল নাগাদ ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পেতে হলে এখন থেকেই কাজ করে যেতে হবে।

Related Analysis