গ্যাস সংকট নিরসনে ব্যয়বহুল এলএনজি কোনো সমাধান নয় বরং বোঝায় পরিণত হয়েছে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাংলাদেশের বাড়তে থাকা গ্যাস সংকটের সমাধান করতে পারেনি, বরং বাড়তি আমদানি ব্যয়ের কারণে অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ দোটানায়, উচ্চ ব্যয়ের কারণে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করা যাচ্ছে না, আবার তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প না থাকায় আমদানি বন্ধও করা যাচ্ছে না। একসময় সরকারি অর্থসংস্থান ছাড়াই স্বচ্ছন্দ্যে চলতে পারা গ্যাস খাত এখন ভর্তুকিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

মোহাম্মদ ইয়ামিন

২০১৮ সালের আগস্টে এলএনজি আমদানি করা শুরু হয়। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকের কাছে বিক্রয়মূল্য ৩২% বাড়ানোর পরেও সরকারের ৬,৩১২ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে ঢালতে হয়েছে। সক্ষমতা ও চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করা হলে এই পরিমাণ আরো বেশি হতে পারতো।

তা সত্ত্বেও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সর্বশেষ প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রতিশ্রুত ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক যুক্ত করা হলে বর্তমান অর্থবছরেই সরকারি ভর্তুকির অংক দাঁড়াবে ২৫,০০০ কোটি টাকায়, অর্থাৎ বাজেটে বরাদ্দকৃত পরিমাণের ছয়গুণেরও বেশি।

পেট্রোবাংলা ও অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন বলছে বিশ্ববাজারে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে এলএনজি আমদানিতে খরচ হবে ৩২,২১৯ কোটি টাকা, অপরাপর ব্যয় যুক্ত করলে যা ৪৪,২৬৫ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে।

বর্তমান দামে গ্যাস বিক্রি হলে পেট্রোবাংলার প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দরকার হবে। বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা সরকারের এলএনজি আমদানির সমালোচনা করছেন। তারা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং বিদ্যমান সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ করছেন, যেহেতু এই খাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিচালনগত সিস্টেম লস হচ্ছে।

জ্বালানী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, “আমদানিকৃত এলএনজি’র মাধ্যমে গ্যাস সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কেবল দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই এর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হতে পারে।”

অন্যদিকে, জ্বালানি শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মো: আব্দুল জলিল বলছেন এলএনজি’র দাম আকস্মিকভাবে বেড়েছে স্পট মার্কেট থেকে আমদানির কারণে, যেটি সম্প্রতি ব্যাপক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে গেছে।

এক ওয়েবিনারে জলিল বলেন, “স্পট মার্কেট থেকে আমরা চাহিদার মাত্র ৪-৫% গ্যাস আমদানি করি, পরিচালনগত সিস্টেম লস কমাতে পারলেই এই চাহিদা আর থাকবে না। গত অর্থবছরে মোট সিস্টেম লস ছিলো ৭.১৭%।” এছাড়া তিনি এলএনজি’র ওপর নির্ভরতা কমাতে বিদ্যমান দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদ দেন।

এলএনজি যেভাবে ব্যয় বাড়াচ্ছে

শিল্পখাতে তীব্র গ্যাস সংকট সামাল দিতে ২০১৮ সাল থেকে সরকার বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করছে। ২০২১ অর্থবছরে দেশে গড়ে দৈনিক ৩০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে। পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এর মাত্র ১৯%, অর্থাৎ ৫৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে এলএনজি থেকে।

যদিও চাহিদার ৮১% দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন থেকেই পূরণ হচ্ছে, বাকি চাহিদা আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে মেটাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে গত অর্থবছরে সরকার এলএনজি আমদানিতে খরচ করেছে ১৮,৮৫০ কোটি টাকা, যেখানে দেশীয় গ্যাসের পেছনে খরচ হয়েছে ৫০০০ কোটি টাকা মাত্র।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে প্রতি ইউনিট রিগ্যাসিফাইড এলএনজিতে খরচ যাচ্ছে ৩০.৮১ টাকা, যেখানে দেশীয় গ্যাসের প্রতি ইউনিটে খরচ হয় ৪.১৮ টাকা (পাবলিক কোম্পানির জন্য ১.২৭ টাকা ও আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির জন্য ২.৯১ টাকা)।

ব্যয়ের বোঝা চাপছে ভোক্তাদের ওপর

এলএনজি আমদানির খরচ ওঠানোর জাদুকরী পন্থা হিসেবে সরকার মূল্যবৃদ্ধিকে বেছে নিয়েছে। গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কোম্পানিগুলো জানুয়ারিতে গ্যাসের মূল্য ১১৭% (রান্নার গ্যাস ১১৫%) বাড়ানোর জন্য বিইআরসি’র কাছে অভিন্ন প্রস্তাবনা জমা দেয়। রেগুলেটরি কমিশন ২১ মার্চ এই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে। গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং রেগুলেটরি কমিশনের টেকনিক্যাল কমিটি গ্যাসের দাম ২০% বাড়ানোর সুপারিশ করে।

এলএনজি দেশে আসতে শুরু করার একবছর পরে, ২০১৯ এ প্রকাশিত সর্বশেষ শুল্কাদেশে বিইআরসি গ্যাসের দাম ৩৩% বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৭.৩৮ টাকা থেকে ৯.৮০ টাকা ধার্য করেছিলো। সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের সাধারণ মূল্য প্রতি ঘনফুট ৪.৪৫ টাকা মাত্র। সুতরাং, এই খাতগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করতে সরকার ইউনিটপ্রতি ৫.৩৫ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশ্লেষণ বলছে একারণে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহে সরকারের বাৎসরিক লোকসান প্রায় ৬,৭৭৩.৮ কোটি টাকা, সর্বোচ্চ ব্যবহারকারী এই খাত দেশের মোট চাহিদার ৪৩-৪৫% গ্যাস ব্যবহার করে।

সর্বশেষ শুল্কাদেশ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন খাত ভর্তুকিতে গ্যাস পাচ্ছে, যেখানে গৃহস্থালী, সিএনজি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, এবং শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য গড় দাম যা হওয়ার কথা ছিলো তারচেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। জ্বালানির এমন উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তাদের প্রাত্যহিক ব্যয় এবং ব্যবসায়ের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সিএনজিতে অতিরিক্ত ২৫.২০ টাকা, গৃহস্থালিতে ২.৮০ টাকা, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের ১৩.২০ টাকা, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে ৭.২৪ টাকা এবং কারখানার জেনারেটরে ইউনিটপ্রতি গ্যাসে ৪.০৫ টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে।

ভবিষ্যত করণীয়

জ্বালানির মূল্য সহনীয় রাখতে এবং আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তির জন্য বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও জ্বালানির মিশ্রণে ক্লিন এনার্জি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।  এক সাম্প্রতিক গবেষণায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকারের এলএনজি আমদানিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বলে বিবেচনা করা উচিত নয়।

“বিদ্যুৎ সরবরাহে গ্যাস-এলএনজি বিতর্ক: বিদ্যুৎখাতের জন্য এলএনজি আমদানির ব্যয় ও প্রভাব” শীর্ষক গবেষণায় ড. মোয়াজ্জেম বলছেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিদ্যমান চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য বিবেচনায় এলএনজি আমদানি চালিয়ে যাওয়া দরকার হতে পারে, বিশেষ করে যেসমস্ত কর্মকাণ্ড ও খাতে তাৎক্ষণিক কোন বিকল্প উপায় নেই।

মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদে, তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচিত হবে জ্বালানী ব্যবহারের অধিকতর ক্লিন উৎসগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখে এলএনজি আমদানির বিকল্প অনুসন্ধান করা।

Related Analysis