ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিপর্যয়ের আশংকা

পাবলিক গ্যাস, পাওয়ার কোম্পানিগুলো ঐতিহাসিক শুল্ক বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের বাড়তি দাম নিয়ে কাজ করতে বাংলাদেশ হিমশিম খাচ্ছিলো। আর এই যুদ্ধের কারণে তো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরো বেড়ে গেল।

ইমরান হোসেইন

এলএনজি বাজারের দামের অস্থিরতা

বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনার জন্য ২১-২৪ মার্চ একটি ধারাবাহিক গণশুনানির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২০ সালের শেষের দিকে এলএনজি স্পট মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করার পর থেকে বাংলাদেশ প্রায় লাগাতার গ্যাস সংকট মোকাবেলা করেছে, যার ফলে প্রায় ৬ মাস ধরে ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলিতে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে না।

গ্যাসের প্রাপ্যতার ঘাটতি

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গ্যাস সঙ্কটের কারণে গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় অর্ধেক হ্রাস পেয়েছে, যা সব গ্যাস সরবরাহের উপর নির্ভর সকল ধরনের উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের অর্ধেক।

রাজধানী ঢাকায় বসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় প্রায়ই অনেক বাসিন্দা দিনের বেলা বাসার খাবার খেতে পারেন না বা অর্ধ-সিদ্ধ খাবার খেতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে শিল্পপতিরা তাদের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর ভয়ে অব্যাহত গ্যাস সংকটে প্রকাশ্যে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের মতে, বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি মেটায় গ্যাস দিয়ে। প্রায় এক দশক ধরে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে মূলত অনুসন্ধান উদ্যোগের অভাবে।

বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ব্যয়বহুল তেলের ব্যবহার

ভয়াবহ গ্যাস সংকট স্পষ্টতই বাংলাদেশকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি তেল ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ খুব কঠিন সময় পার করছে, গ্যাসের রেশনিং পরিমান বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, ইউটিলিটি ট্যারিফ বাড়তে চলেছে এবং লোডশেডিং আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।’

পিডিবির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকে, নিজস্ব গ্যাসের রিজার্ভ ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকা বাংলাদেশ শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে তার বার্ষিক তেল আমদানি প্রায় ২৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

কিন্তু তেল ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুত গ্যাস-ভিত্তিক উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল, পরিস্থিতি বিচারে যা কখনো কখনো পাঁচ গুণ পর্যন্ত।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’

পাওয়ার সেলের ডিজি দাবি করেছেন যে মানুষের যতক্ষণ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা দাম নিয়ে খুব একটা চিন্তা করে না।

তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ভিন্ন মত রয়েছে। যখন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারায় তখন তারা বলেছিল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি জনগণের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস করে, বিশেষ করে দরিদ্র এবং স্থির আয়ের জনগোষ্ঠীর উপর চাপ সৃষ্টি করে।

পণ্য এবং শক্তি ক্রয়ের বর্ধিত মূল্য

ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রাখতে দরিদ্র মানুষ তাদের খাদ্যব্যায় এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা যেমন চিকিৎসার ব্যায় সংকোচন করছে – এমন সংবাদে দেশীয় সংবাদ মাধ্যমে অহরহ উঠে আসছে।

কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে এমন সরকারি ভর্তুকি দেওয়া দোকানগুলোর সামনে (টিসিবি’র দোকান) ইতিমধ্যেই মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ইতিমধ্যেই অনেকের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দর বৃদ্ধি সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে গত ১৩ বছরে, গ্যাসের শুল্ক সাতবার বাড়ানো হয়েছিল, সর্বশেষ বৃদ্ধি করা হয়েছিল ২০১৯ সালের জুলাইয়ে। গৃহস্থালীতে ব্যবহৃত ডাবল গ্যাস বার্নারের নির্দিষ্ট মাসিক শুল্ক ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পপতিরা জানান, তাদের শুল্ক ৩০০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে বিইআরসি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিদ্যুতের দাম ২০০৯ সালের পর ১০ বার বাড়ানোয় তা মোট ৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট

অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিশোধিত ব্যয় ও জ্বালানীর বর্ধিত মূল্যের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাঁধে ৭৬, ০০০ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা চেপে বসেছে।

২০২০-২১ সালে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যেগুলো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করতে হয়েছে সেগুলোর ৪০ শতাংশের বেশি উৎপাদনে ব্যবহৃতই হয়নি।

ইউএস-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট অফ এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল যে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির অভাব এবং নির্মাণাধীন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংযোজন থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে বিদ্যুতের অতিরিক্ত ক্ষমতা (ওভার ক্যাপাসিটি) ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি বেশিরভাগ জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬০০০ মেগাওয়াট এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সে কারণে আমরা অলস বসে থাকতে পারি না।’

বর্ধিত এলএনজি ট্যারিফ

এশিয়ায় এলএনজি স্পট মূল্য প্রতি এমবিটিইউ ৫৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। ১১ মার্চ এসএন্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটস পূর্বাভাস দিয়েছে যে বছরের বাকি সময়ে এলএনজি স্পট মূল্য ২৫ ডলার প্রতি এমবিটিউ-এর উপরে থাকবে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে এলএনজির মূল্য প্রতি এমবিটিইউ-তে ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন অবস্থানে, তথা ৬ ডলার থাকলেও এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশ কখনই তার ১০০০ এমএমসিএফডি সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেনি।

মার্চের শুরুতে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যারেল প্রতি আন্তর্জাতিক তেলের দাম বিশাল উলম্ফন হয়, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু জানুয়ারির শুরুতে ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের উপরে চলতে থাকে। ১৫ মার্চ, প্রতি ব্যারেল ১১১ ডলারে বিক্রি হয়েছিল এই পরস্থিতি আরেক দফা গ্যাস এবং বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি অনিবার্য করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক তেলের বাজার উচ্চ হওয়ার আগেই, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গ্যাস কোম্পানিগুলি গ্যাসের শুল্ক ১২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। পিডিবি ৬৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়ন করে।

গ্যাস কোম্পানিগুলো তাদের এই আবেদনের মধ্যে অধিক দামে এলএনজি আমদানি করাকে এই ঐতিহাসিক এই মূল্য বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে হাজির করেছে। গ্যাস কোম্পানিগুলো বলেছে যে এলএনজির উচ্চ মূল্য তাদের ব্যবসাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

একটি গণশুনানিতে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড দাবি করেছিল যে তাদের ট্রান্সমিশন চার্জ ২০২১-২২ সালে ১২৯ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ সালে আরও ২৬ শতাংশ বাড়ানো হবে।

‘বেশি দামের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর আবারো নির্ভর করলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি আরো বাড়তে থাকবে। আরও জরুরি বিষয় হচ্ছে যে  বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকারক বিষয়টি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।’ গত ফেব্রুয়ারিতে আইইইএফএ এর জ্বালানি অর্থনীতি বিশ্লেষক সাইমন নিকোলাস এমনটিই বলেছিলেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ফেব্রুয়ারিতে সতর্ক করেছিল যে বাংলাদেশ তার এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়ালে বিপর্যয়কর আর্থিক পরিণতি হবে৷

নবায়নযোগ্য শক্তির উপর নির্ভরতা

সিপিডি বরং পরামর্শ দিয়েছে যে বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরে নবায়নযোগ্য উৎসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করে তার বিদ্যুতের অতিরিক্ত ক্ষমতাকে একটি সুযোগে পরিণত করবে।

বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রতি উদাসীনতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে গত দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে ব্যাপকভাবে ভর্তুকি দেওয়া, এবং এ সময়ে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ২ শতাংশেরও কম নবায়নযোগ্য উৎস নির্ভর।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সমন্বিত মাস্টার প্ল্যানটি প্রণয়ন করা হচ্ছে তা নবায়নযোগ্য জ্বালানী সম্প্রসারণের উপর আরও বেশি নির্ভরশীল  একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা অবশেষে দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সংকটের সমাধান নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যেই উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন বলে মনে হচ্ছে।

Related Analysis